রাজধানী ঢাকায় জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে রাইডশেয়ারিং খাতে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে মোটরসাইকেল চালকদের। এক সময় তরুণদের জন্য নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস হিসেবে পরিচিত এই পেশা এখন অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
চালকদের অভিযোগ, আগে যেখানে দিনে গড়ে দেড় হাজার টাকার বেশি আয় করা যেত, এখন তা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। ট্রিপের সংখ্যা কমে যাওয়া, তেলের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা এবং ভাড়া না বাড়ায় আর্থিক চাপে পড়ছেন তারা। অনেকেই পেশা পরিবর্তন বা বিদেশে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশে জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার আগে চালকেরা তুলনামূলক স্বস্তিতে ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন অনেকেই দিনে ৭০০–৮০০ টাকাও আয় করতে পারছেন না, ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নতুনবাজার এলাকায় কথা হয় চালক শরীফ সুজনের সঙ্গে। তিনি জানান, আগে আধাবেলা কাজ করেই ১,০০০ টাকা আয় হতো, আর সারাদিন কাজ করলে ১,৫০০ টাকার মতো পাওয়া যেত। কিন্তু এখন ঈদের পর থেকে আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে। অ্যাপে ট্রিপও কম আসে, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও যাত্রী পাওয়া যায় না।
একই অভিজ্ঞতা জানান রামপুরার চালক কবির হোসেন। তিনি বলেন, সকাল থেকে বের হয়েও অনেক সময় একটি ট্রিপ পাওয়া যায় না। তার ওপর তেলের জন্য আবার দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। ফলে কাজের সময়ই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
চালকদের মতে, জ্বালানি সংকট শুধু সময় নষ্ট করছে না, বরং কাজের ধারাবাহিকতাও ভেঙে দিচ্ছে। দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তেল নিতে গিয়ে অনেক ট্রিপ মিস হচ্ছে, ফলে সম্ভাব্য আয় আরও কমে যাচ্ছে।
চলতি বছরের মার্চের শুরু থেকে দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। প্রায় এক মাস পার হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বর্তমানে প্রতিদিন তেল নিতে গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হচ্ছে চালকদের। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, এই সংকটের মধ্যেও রাইডশেয়ারিং ভাড়ায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। চালকদের দাবি, অ্যাপভিত্তিক ভাড়া আগের মতোই রয়েছে। দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া বাড়েনি, ফলে সময় ও খরচ বাড়লেও আয় বাড়ছে না।
চালক ফরিদুল ইসলাম জানান, নতুনবাজার থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত ভাড়া এখনও ১৭০–১৮০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আরেক চালক মুরাদ আলী বলেন, আবুল হোটেল থেকে ধানমন্ডি পর্যন্ত ভাড়া ১৪০–১৬০ টাকার মধ্যেই থাকে। চুক্তিতে কিছুটা বেশি পাওয়া গেলেও তা নিয়মিত নয়।
চালকদের ভাষ্য, ঢাকায় রাইডশেয়ারিং চালকের সংখ্যা বেশি হলেও যাত্রী তুলনামূলক কম। ফলে কেউ বেশি ভাড়া চাইলে যাত্রীরা সহজেই অন্য চালকের কাছে চলে যান। এই প্রতিযোগিতার কারণে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগও নেই।
যাত্রীরাও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ভাড়ায় বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে চালকদের কষ্ট চোখে পড়ছে— অনেক সময় তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা যায়, কখনো যাত্রীর জন্য, আবার কখনো তেলের জন্য।



