১৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিস্তা মহাপরিকল্পনা, হজের খরচ কমানোসহ নানা উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে দেশের অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, পানি ব্যবস্থাপনা, কর আদায়, শ্রমবাজার ও হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের চলমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। বুধবার (১৭ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত জবাব টেবিলে উপস্থাপন করা হয়।

তিস্তা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের লক্ষ্যে আরও একটি ব্যারেজ নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যারেজ নির্মাণের কারিগরি ও আর্থিক দিকগুলো বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, তিস্তা নদীকেন্দ্রিক একটি টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য পরিচালিত সমীক্ষা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় ১১০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ১১০ কিলোমিটার নদী খনন বা ড্রেজিং, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও বাঁধের ওপর সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ৬৭টি গ্রোয়েন বা স্পার নির্মাণ ও সংস্কার এবং প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বাস্তবায়ন করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, হামের বিস্তার, টিকাদান কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতিগত ও প্রশাসনিক বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং সরকারি বিধি অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তনের কারণে টিকাদান কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কি না, তা তথ্য-উপাত্ত ও কারিগরি বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে সরকার টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, মজুত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, রোগ নজরদারি সম্প্রসারণ, দ্রুত প্রাদুর্ভাব শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ টিকাদান কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে পাবনা মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানের একটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক খাতে কর আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই হার ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার বিভিন্ন সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় মহাসড়কগুলোকে পর্যায়ক্রমে এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে। সড়কের ওপর চাপ কমাতে মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে এবং ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে আধুনিক এক্সেল লোড ও স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হবে।

তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। ঢাকার যানজট কমাতে রিং রোড ও রেডিয়াল নেটওয়ার্ক নির্মাণ এবং গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনগুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও শুরু করা হয়েছে।

রেল খাতের উন্নয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, যাতায়াতের সময় কমানো এবং পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রেলসেবা পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি জেলা ও প্রধান শহরে সম্প্রসারণ করা হবে। ভবিষ্যতে আন্তঃনগর ও কমিউটার ট্রেনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হবে।

বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক ও শ্রম কূটনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং অভিবাসনসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কাজ চলছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করার পরিকল্পনা রয়েছে।

পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা তাদের মোট পানির প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে সংগ্রহ করে এবং বাকি অংশ পদ্মা, মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীসহ বিভিন্ন ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে নেয়।

চট্টগ্রাম ওয়াসার সরবরাহকৃত পানির প্রায় ৯২ শতাংশ আসে নদী ও জলাধার থেকে। অন্যদিকে রাজশাহী ওয়াসার প্রায় ৯৮ শতাংশ পানি এখনও ভূগর্ভস্থ উৎসের ওপর নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, খুলনা ও বরিশালে নদীর পানির লবণাক্ততা বড় চ্যালেঞ্জ হওয়ায় সেখানে আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং বিকল্প জলাধার নির্মাণের কাজ চলছে। সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে পর্যাপ্ত ভূ-উপরিস্থ পানির সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিরাপদ সুপেয় পানি সরবরাহের জন্যও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিভাগীয় শহরগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করা।

গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার জনবল পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী জানান, উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ১৭ হাজার ৮৭০টি অনুমোদিত পদ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ১১ হাজার ৫০১টি পদে জনবল কর্মরত থাকলেও ৬ হাজার ৩৫৯টি পদ এখনও শূন্য রয়েছে।

হজের ব্যয় কমানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য হজকে আরও সহজলভ্য করতে সরকার ভবিষ্যতে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেবে। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তিনি জানান, ২০২৫ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের সর্বনিম্ন প্যাকেজ মূল্য ছিল ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৪২ টাকা। ২০২৬ সালে সেই ব্যয় ১১ হাজার ৭৫ টাকা কমানো হয়েছে, যার সুফল হজযাত্রীরা পেয়েছেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সৌদি আরবের নির্ধারিত খরচ বিবেচনায় রেখে ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজের মূল্য আরও কমানো বা যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণের সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে বলে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।