পাকিস্তান নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চালাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ইসলামাবাদের এই আকাঙ্ক্ষা ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার তুলনায় বেশ সীমিত; কারণ দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা নিরসনে এখনো গভীর ও জটিল আন্তর্জাতিক সমীকরণগুলোই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধ কয়েক দশকের। মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর মতভেদ এই উত্তেজনা জিইয়ে রেখেছে। হরমুজ প্রণালীর কাছে নৌ-মহড়া থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছায়াযুদ্ধের (Proxy War) মতো ঘটনাগুলো বারবার আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে একটি ‘অস্থিতিশীল অচলাবস্থা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে সংঘাতের উচ্চ ঝুঁকি থাকলেও সরাসরি যুদ্ধের পথে হাঁটছে না কোনো পক্ষই।
এই পটভূমিতে, ইসলামাবাদ উভয় পক্ষের সাথে তাদের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে আলোচনার পথ প্রশস্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছে। পাকিস্তানের একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে, তেমনি প্রতিবেশী দেশ ইরানের সাথে রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। এই দ্বিমুখী সম্পর্কের কারণেই একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখাচ্ছে পাকিস্তান।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ঐতিহাসিকভাবে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার স্পর্শকাতর যোগাযোগগুলো ওমান কিংবা সুইজারল্যান্ডের মতো অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও প্রতিষ্ঠিত ‘ব্যাকচ্যানেল’-এর মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসছে। পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপরীতে এই প্রতিষ্ঠিত চ্যানেলগুলোর সাফল্যের সুনির্দিষ্ট নজির রয়েছে:
ওমানের গোপন মধ্যস্থতা ও পারমাণবিক চুক্তি (২০১২-২০১৫): মার্কিন সিআইএ ডিরেক্টর উইলিয়াম জে. বার্নস তার স্মৃতিকথা ‘দ্য ব্যাক চ্যানেল’-এ উল্লেখ করেছেন যে, ২০১২ সাল থেকেই ওমানের তৎকালীন সুলতান কাবুস বিন সাইদ অত্যন্ত গোপনে ওবামা প্রশাসন এবং তেহরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার ব্যবস্থা করেছিলেন। এপি নিউজ (AP News) ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওমানের রাজধানী মাস্কাটে অনুষ্ঠিত সেই গোপন বৈঠকগুলোই পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) স্বাক্ষরের মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল। ওমান আজও এই দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ‘সেতু’ হিসেবে স্বীকৃত।
সুইজারল্যান্ডের ‘প্রটেক্টিং পাওয়ার’ ভূমিকা: ১৯৮০ সাল থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দূতাবাস না থাকায় সুইজারল্যান্ড সেখানে মার্কিন স্বার্থ দেখাশোনা করছে। রয়টার্স এবং আল জাজিরার ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচিত বন্দী বিনিময় এবং জব্দকৃত ৬ বিলিয়ন ডলার অর্থ ছাড়ের যে জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল, তাতে সুইজারল্যান্ড ও কাতার প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিল। কয়েক দশক ধরে সুইজারল্যান্ড এভাবেই সরাসরি সংলাপের অনুপস্থিতিতে একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছে।
এই দীর্ঘমেয়াদী এবং প্রতিষ্ঠিত চ্যানেলগুলোর বাইরে পাকিস্তানের জন্য নতুন করে জায়গা করে নেওয়া বেশ কঠিন। কারণ উভয় দেশের মধ্যকার মূল দ্বিমতগুলো এখনো অপরিবর্তিত। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কঠোর সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। বিপরীতে ইরান দাবি করছে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর কোনো চাপ প্রয়োগ করা হবে না—এমন গ্যারান্টি। দুই পক্ষের এই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণেই বারবার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে।
আঞ্চলিক সমীকরণ বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশ এই সংকটের গতিপথ নির্ধারণ করছে। ফলে যেকোনো বড় ধরনের অগ্রগতির জন্য কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের দ্বিপাক্ষিক সমঝোতাই যথেষ্ট নয়, বরং অন্যান্য প্রভাবশালী অংশীদারদের স্বার্থের সমন্বয়ও অপরিহার্য।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতাকে নির্ণায়ক হওয়ার চেয়ে বরং ‘আকাঙ্ক্ষা-নির্ভর’ বলেই মনে হচ্ছে। ইসলামাবাদ আলোচনার জন্য একটি উপযুক্ত মঞ্চ তৈরি বা আস্থা বৃদ্ধিতে সীমিত অবদান রাখতে পারলেও, কোনো পক্ষকেই তাদের মূল অবস্থান থেকে নড়ানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক প্রভাব দেশটির নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই উদ্যোগ মূলত বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণের একটি চেষ্টা। এই সীমিত মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল করতে পারে, বিশেষ করে যদি দুই দেশের উত্তেজনা আরও চরমে পৌঁছায়। তবে শেষ পর্যন্ত, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মৌলিক অবস্থানে দৃশ্যমান পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত যেকোনো মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাই ফলপ্রসূ হওয়া কঠিন। এই অচলাবস্থা নিরসনের পথে আলোচনার সুযোগের চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ‘কৌশলগত অবিশ্বাস’।



