রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভিসা জটিলতা এবং যাতায়াতের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছে ইরান। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও প্রথম ম্যাচে দারুণ লড়াই করে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। দুইবার পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরে এসে গুরুত্বপূর্ণ এক পয়েন্ট অর্জন করেছে তারা।
বিশ্বকাপের মতো বড় আসর সাধারণত ফুটবলার ও সমর্থকদের জন্য আনন্দ, উত্তেজনা ও উৎসবের উপলক্ষ হয়ে আসে। কিন্তু ইরানের জন্য এবারের অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। ম্যাচের আগে অধিনায়ক মেহদি তারেমি জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপ নিয়ে অন্য দলগুলোর মতো উচ্ছ্বাস তাদের মধ্যে কাজ করছে না। কারণ গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশের ফুটবল কার্যক্রম এবং বিশ্বকাপ প্রস্তুতি নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
ইরানের সব ম্যাচই অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশটির পক্ষ থেকে ম্যাচগুলো মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়ার দাবি তোলা হলেও ফিফা সেই অনুরোধ গ্রহণ করেনি। তবে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় ইরান। নিরাপত্তা ও ভ্রমণসংক্রান্ত কারণে তারা নিজেদের অনুশীলন ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর তিজুয়ানায় নিয়ে যায়। এখন প্রতিটি ম্যাচের আগের দিন তারা যুক্তরাষ্ট্রে আসে এবং খেলা শেষে দ্রুত মেক্সিকোতে ফিরে যায়।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচের শুরু থেকেই চমক দেখায় নিউজিল্যান্ড। ম্যাচের মাত্র সপ্তম মিনিটে গোল করে এগিয়ে যায় তারা। অধিনায়ক ক্রিস উড দুর্দান্ত দক্ষতায় ইরানের গোলরক্ষককে কাটিয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলিজাহ জাস্টের কাছে পাস দেন। জাস্ট প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের মাঝখান থেকে অসাধারণ ভলিতে বল জালে পাঠিয়ে দলকে এগিয়ে দেন।
প্রথম দিকে গোল হজম করলেও ধীরে ধীরে ম্যাচে নিজেদের ছন্দ ফিরে পায় ইরান। আক্রমণের চাপ বাড়াতে থাকে তারা। এর ফলও আসে প্রথমার্ধের ৩২ মিনিটে। রেজাইয়ান বুটের বাইরের অংশ দিয়ে চমৎকার এক চিপ শট নিয়ে গোল করেন এবং ম্যাচে সমতা ফেরান।
বিরতির পর আবারও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে নিউজিল্যান্ড। ৫৪তম মিনিটে ক্রিস উডের আরেকটি সহায়তায় দ্বিতীয় গোলটি করেন এলিজাহ জাস্ট। ভিড়ের মধ্যে থেকেও নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন তিনি। সেই সঙ্গে নিউজিল্যান্ড আবারও এগিয়ে যায়।
তবে ইরান হাল ছাড়েনি। মাত্র ১২ মিনিট পরই তারা আবারও ম্যাচে সমতা ফেরায়। রেজাইয়ানের দীর্ঘ ও নিখুঁত পাস থেকে মোহেবি দারুণ এক হেডে গোল করে স্কোরলাইন ২-২ করেন। এরপর দুই দলই বেশ কয়েকটি ভালো সুযোগ তৈরি করলেও আর কোনো গোল হয়নি।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ইরানের চেয়ে ৬৫ ধাপ পিছিয়ে থাকা নিউজিল্যান্ড ম্যাচজুড়ে দুর্দান্ত লড়াই করেছে। ২০১০ সালের পর বিশ্বকাপে ফেরা দলটি জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। ফলে বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথম জয়ের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো তাদের।ম্যাচ শেষে মাঠে দেখা যায় ক্রীড়াসুলভ এক সুন্দর পরিবেশ। দুই দলের খেলোয়াড়রা একে অপরকে আলিঙ্গন করেন, করমর্দন করেন এবং জার্সিও বিনিময় করেন। ইরানের কোচ আমির ঘালেনোয়ি ডাগআউটে কিছুক্ষণ একা বসে থাকলেও তার খেলোয়াড়রা মাঠ ঘুরে সমর্থকদের অভিনন্দন জানান। হাজারো ইরানি সমর্থক তখন পতাকা উড়িয়ে দলকে উৎসাহ দিতে থাকেন।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক চাপ, ভ্রমণ জটিলতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও ইরান বিশ্বকাপের শুরুটা করেছে সাহসিকতার সঙ্গে। আর দুইবার পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরে এসে তারা প্রমাণ করেছে, মাঠের লড়াইয়ে এখনও তারা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী।



