১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত এক বছরেই বাড়ল ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (এসএনবি) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে, দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিক এবং ব্যাংকগুলোর জমা রাখা অর্থের পরিমাণ গত বছর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির হারকে দেশটির ব্যাংকিং ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসএনবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সেখানে জমা থাকা মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে প্রতি সুইস ফ্রাঁর বিনিময় মূল্য ১৫২ টাকার বেশি ধরে এই হিসাব করা হয়েছে।

ইতিহাসে এর আগে কেবল ২০২১ সালেই এর চেয়ে বেশি অর্থ সুইস ব্যাংকে জমা ছিল। সেই বছর বাংলাদেশিদের মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৮৭১ দশমিক ১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড। গত বছরের এই বড় লাফ বা উল্লম্ফনের ফলে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২০২১ সালের সেই সর্বোচ্চ রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই আমানত বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংক। বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর জমা রাখা অর্থ এক বছরের ব্যবধানে ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে ব্যাংকগুলোর জমার পরিমাণ ছিল ৫৭৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২২ দশমিক ৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে থাকা বাংলাদেশিদের মোট তহবিলের সিংহভাগই এখন বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর দখলে। গত বছর মোট আমানতের প্রায় ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশই ছিল বিভিন্ন ব্যাংকের অর্থ। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালেও এই হার ছিল ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ, যা তার আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।

তবে ব্যাংকগুলোর আমানত বাড়লেও বাংলাদেশি ব্যক্তিগত গ্রাহকদের সরাসরি অ্যাকাউন্ট বা জমার পরিমাণ কিছুটা কমেছে। ২০২৪ সালে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে আমানতের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। গত বছর তা প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১১ দশমিক ৪ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে নেমে এসেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার ক্ষেত্রে ভারতের নাগরিক ও ব্যাংকগুলো বরাবরের মতোই শীর্ষে রয়েছে। ২০২৫ সালে তাদের মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। তবে ভারতের এই জমার পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

ভারত শীর্ষে থাকলেও এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের আমানত যেখানে কমেছে, সেখানে বাংলাদেশের আমানত ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ আফগানিস্তানের আমানতও প্রায় ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে দাঁড়িয়েছে।

অতীতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৭ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ। এরপর ২০১৮ সালে তা কমে ৬২ কোটি এবং ২০১৯ সালে ৬০ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁতে নামে। ২০২০ সালে এই অঙ্ক আরও কমে ৫৬ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁতে নেমেছিল, যার পর থেকে আবারও তা বাড়তে শুরু করে।

সাধারণত সুইজারল্যান্ডের কঠোর ব্যাংকিং গোপনীয়তা নীতির কারণে বিশ্বজুড়ে মানুষ সেখানে অর্থ জমা রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সুইস আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখে এবং কারও কাছে তা প্রকাশ করতে বাধ্য নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক নানা চাপ ও সমালোচনার কারণে সুইজারল্যান্ড সরকার কিছু ক্ষেত্রে তথ্য সরবরাহ শুরু করায় অনেকেই এখন সেখান থেকে অন্য দেশে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন।